নিপুন হাতের কারুকাজ হাজার দুয়ারি জমিদার বাড়ি

March 7, 2017 8:53 PM0 commentsViews: 766

পাবনা ব্যুরো প্রধান এম আ এ সাইদ ( তন্ময়) রাজশাহী থেকে ফিরে :
রাজশাহীর বাগমারা বীরৎসার জমিদার বাড়ি দেশের একমাত্র হাজার দুয়ারি জমিদার বাড়ি। যথাযথ সংরক্ষণের যদিও আগাছায় ঘেরা এখন এর চারপাশ। খসে পড়ছে পলেস্তারা। ইটের ফাঁকে দেখা মিলছে মরিচা ধরা লোহার রড। দরজা-জানালা সবই ভাঙা। তার পরও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। ভবনটি এখন পরিবেশদূষণের নীরব সাক্ষী। বেদখল হয়ে যাচ্ছে এর সম্পদ।
জমিদারি প্রথানুযায়ী তৎকালীন বীরকুৎসা ছিল একটি পরগনা। আর এ পরগনার জমিদার হলেন সুদূর কাশী থেকে আসা বিরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে বিরু বাবু। কথিত আছে পার্শবর্তী আত্রাইয়ের আমরুল ডিহি বিশার রাজা ছিলেন গোপাল ধাম। প্রভাতী বালা নামে তার এক রুপবতী কন্যা ছিল। রাজ জামাতা হওয়ার সুবাদে, রাজা গোপাল ধাম বিরেশ্বর বন্দোপাধ্যায় ও কন্যা প্রভাতী বালার নামে বীরকুৎসা পরগনা লিখে দেন। প্রভাতী বালা ছিলেন একজন শৌখিন মানুষ। তার পছন্দ অনুযায়ী বিরেশ্বর বাবু বীরকুৎসায় গড়ে তুলেন এক সুরম্য অট্টালিকা। এর মাঝে ছিল এক হাজার দুয়ার, সেগুলো সেগুন কাঠের কারুকাজ করা।
দরজাগুলোয় কাঠ, লোহা ও দামি কাচের ব্যবহার ছিল। রানী প্রভাতী বালা প্রাসাদের সব দরজা, মেঝে, আসবাব, চাকর-বাকরদের দিয়ে ধুয়েমুছে ঝকঝকে করে রাখতেন। বিরেশ্বরের আরো দুই ভাই দুর্গা বাবু ও রোমা বাবু এই প্রাসাদেই থাকতেন। প্রাসাদের সামনে ছিল বাহারি ফুলের বাগান। স্থানীয়রা আজ তা দখল করে, সেখানে বাজার গড়ে তুলেছে। প্রাসাদের পশ্চিম দিকে খিড়কি দরজা পার হয়ে সান বাঁধানো এক বিরাট পুকুর ছিল। সেই পুকুরে শুধু জমিদার পরিবারই গোসল করত। এই পুকুরও আজ বেদখল।
প্রাসাদের ভেতরে এক পাশে ছিল জলসাঘর। সেখানে বসত গানের আসর। কলকাতা থেকে ভোলানাথ অপেরা এসে গান, বাজনা করত। পুবদিকের দেউরির পাশে ছয়জন করে, বারে জন বরকান্দাজ থাকত। তার পাশে ছিল মালখানা। এর কিছুু দূরে ছিল মাহাফেজখানা। বকুল তলার পাশে ছিল খাজনা আদায়ের ঘর, যা এখন তফসিল অফিস হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এর পাশে ছিল পূজামন্ডপ, যেখানে স্থাপিত হয়েছে পোস্ট অফিস। ভবনের ভেতরে অনেক কক্ষ ফাঁকা আছে।
দামি শ্বেত পাথর, উন্নত কাঠের দরজা, গ্রিল এবং কাঁচ প্রায় সবই চুরি হয়ে গেছে। প্রাসাদের পুবের দেউরি পার হয়ে সামনে আরেকটা বড় পুকুর ছিল। এখানে গোসল করত আমলা, পেয়াদা ও বরকন্দাজরা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রকাশ্যে প্রাসাদের ভেতরে বসেছে জুয়ার আসর। আর রাতে চলে নেশার আড্ডা। প্রাসাদের কাছে ১৯১৭ সালে জমিদার বিরেশ্বর বাবুর দাদা অবিনাশের নাম অনুসারে বীরকুৎসা অবিনাশ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
হাজার দুয়ারীর চারপাশসহ বিভিন্ন জায়গায় জমিদারের ফেলে যাওয়া ৫০০ বিঘা জামি স্থানীয় প্রভাবশালীরা বিভিন্নভাবে দখল করে রেখেছে। বাকি জমি যে যেভাবে পেয়েছে দখল করে নিয়েছে। দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে রেন্ট রোল অ্যাক্টের বলে, জমিদারি প্রথা উঠে যায়। এই বিশাল অট্টালিকা বিপুল সম্পদ ও জমিজমা ফেলে বিরেশ্বর সপরিবারে ভারত চলে যান। তারা চলে যাওয়ার পর স্থানীয় কয়েক জন মিলে জমিদার বাড়ির অনেক জিনিসপত্র বিক্রি করে দেয়। সূত্র জানায়, প্রাসাদের মূল অংশ এখনো ভাল রয়েছে। এছাড়া এখানকার সবকিছু মিলে প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পদ বেদখল হয়ে গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে এই হাজার দুয়ারির ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারের সুনজর দরকার বলে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।

Leave a Reply